ঢাকা    সোমবার, ১১ মে ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

কপোতাক্ষ তীরে ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী হারাল যশোর; সংরক্ষণে অবহেলার অভিযোগ

কালবৈশাখীর ঝড়ে উপড়ে গেল মধুসূদন দত্ত'র স্মৃতিবিজড়িত বটগাছ, শোকাহত সাগরদাঁড়ি


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০২ মে ২০২৬

কালবৈশাখীর ঝড়ে উপড়ে গেল মধুসূদন দত্ত'র স্মৃতিবিজড়িত বটগাছ, শোকাহত সাগরদাঁড়ি
ছবি : সংগৃহীত

যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসুদন দত্ত-এর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বটগাছটি কালবৈশাখীর ঝড়ে উপড়ে পড়েছে। শনিবার দুপুরে আকস্মিক ঝড় ও প্রবল বৃষ্টিতে কপোতাক্ষ নদের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী এই বটবৃক্ষ ভেঙে পড়লে এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।

‘দেব-অবতার ভাবি বন্দে যে তোমারে,

নাহি চাহে মনঃ মোর তাহে নিন্দা করি,

তরুরাজ! প্রত্যক্ষতঃ ভারত সংসারে

বিধির করুণা তুমি তরু–রূপ ধরি।’

চারটি চরণ মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বটবৃক্ষ’ কবিতার। তাঁর এই কবিতার স্মৃতিবিজড়িত বটগাছটি উপড়ে গেছে। আজ শনিবার দুপুরের কালবৈশাখীর ঝড়ে গাছটি উপড়ে পড়ায় যশোরের কেশবপুরের সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ নদের তীরের মানুষ আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। 

স্থানীয়রা জানান, দুপুরের দিকে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে প্রবল দমকা হাওয়া ও বৃষ্টির সঙ্গে কালবৈশাখী শুরু হয়। এ সময় কবির বাড়ির পূর্ব পাশে কপোতাক্ষ নদ-এর তীরে অবস্থিত বিশাল বটগাছটি ঝড়ের তাণ্ডবে মাটিসহ উপড়ে পড়ে। বহুদিন ধরে দুর্বল হয়ে থাকা গাছটি শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির এই আঘাত সহ্য করতে পারেনি।

এই বটবৃক্ষ শুধু একটি গাছ ছিল না, এটি ছিল বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের এক অনন্য প্রতীক। মধুসূদনের বিখ্যাত ‘বটবৃক্ষ’ কবিতার অনুপ্রেরণা হিসেবে পরিচিত এই গাছটিকে ঘিরে ছিল তাঁর শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি। কবিতার চরণে তিনি গাছটিকে “তরুরাজ” বলে অভিহিত করে এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগ প্রকাশ করেছিলেন।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা সুনীল হালদার (৭০) বলেন, এই বটগাছকে ঘিরে তাদের জীবনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা এখানে এসে গাছটি দেখতেন, ছবি তুলতেন এবং কবির স্মৃতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতেন। গাছটি উপড়ে পড়ায় সেই ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেন হারিয়ে গেল।

এ বিষয়ে মধুসূদন একাডেমির পরিচালক ও গবেষক কবি খসরু পারভেজ জানান, ১৮৬৫ সালে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে অবস্থানকালে মধুসূদন তাঁর শৈশবের স্মৃতিময় এই বটগাছকে কেন্দ্র করে ‘বটবৃক্ষ’ কবিতাটি রচনা করেন। পরবর্তীতে ১৮৬৭ সালে ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলি’ গ্রন্থে এটি প্রকাশিত হয়। তাঁর ভাষায়, “এই গাছটি শুধু একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়, এটি ছিল কবির স্মৃতি, আবেগ এবং বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।”

তবে দীর্ঘদিন ধরেই গাছটির সংরক্ষণ নিয়ে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গাছটি রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নিয়মিত পরিচর্যা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হলে হয়তো এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি আরও কিছুদিন টিকে থাকতে পারত।

এলাকাবাসী বলেন, ‘আমরা বহুদিন ধরে কবির স্মৃতিময় বটবৃক্ষটি রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু বটবৃক্ষটি রক্ষার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করায় কবির শেষ স্মৃতিচিহ্নটিও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এটা খুবই বেদনার এবং কষ্টের।’

এখন প্রশ্ন উঠছে, দেশের অন্যান্য ঐতিহাসিক ও স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণে কতটা কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে ঐতিহ্য সংরক্ষণে সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ঘটনার পর এলাকাবাসী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, এটি কেবল একটি গাছের পতন নয়, বরং জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান। 

বিষয় : কপোতাক্ষ নদ বটবৃক্ষ তরুরাজ চতুর্দশপদী কবিতাবলি মাইকেল মধুসুদন দত্ত

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সোমবার, ১১ মে ২০২৬


কালবৈশাখীর ঝড়ে উপড়ে গেল মধুসূদন দত্ত'র স্মৃতিবিজড়িত বটগাছ, শোকাহত সাগরদাঁড়ি

প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬

featured Image

যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসুদন দত্ত-এর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বটগাছটি কালবৈশাখীর ঝড়ে উপড়ে পড়েছে। শনিবার দুপুরে আকস্মিক ঝড় ও প্রবল বৃষ্টিতে কপোতাক্ষ নদের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী এই বটবৃক্ষ ভেঙে পড়লে এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।

‘দেব-অবতার ভাবি বন্দে যে তোমারে,

নাহি চাহে মনঃ মোর তাহে নিন্দা করি,

তরুরাজ! প্রত্যক্ষতঃ ভারত সংসারে

বিধির করুণা তুমি তরু–রূপ ধরি।’

চারটি চরণ মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বটবৃক্ষ’ কবিতার। তাঁর এই কবিতার স্মৃতিবিজড়িত বটগাছটি উপড়ে গেছে। আজ শনিবার দুপুরের কালবৈশাখীর ঝড়ে গাছটি উপড়ে পড়ায় যশোরের কেশবপুরের সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ নদের তীরের মানুষ আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। 

স্থানীয়রা জানান, দুপুরের দিকে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে প্রবল দমকা হাওয়া ও বৃষ্টির সঙ্গে কালবৈশাখী শুরু হয়। এ সময় কবির বাড়ির পূর্ব পাশে কপোতাক্ষ নদ-এর তীরে অবস্থিত বিশাল বটগাছটি ঝড়ের তাণ্ডবে মাটিসহ উপড়ে পড়ে। বহুদিন ধরে দুর্বল হয়ে থাকা গাছটি শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির এই আঘাত সহ্য করতে পারেনি।

এই বটবৃক্ষ শুধু একটি গাছ ছিল না, এটি ছিল বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের এক অনন্য প্রতীক। মধুসূদনের বিখ্যাত ‘বটবৃক্ষ’ কবিতার অনুপ্রেরণা হিসেবে পরিচিত এই গাছটিকে ঘিরে ছিল তাঁর শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি। কবিতার চরণে তিনি গাছটিকে “তরুরাজ” বলে অভিহিত করে এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগ প্রকাশ করেছিলেন।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা সুনীল হালদার (৭০) বলেন, এই বটগাছকে ঘিরে তাদের জীবনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা এখানে এসে গাছটি দেখতেন, ছবি তুলতেন এবং কবির স্মৃতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতেন। গাছটি উপড়ে পড়ায় সেই ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেন হারিয়ে গেল।

এ বিষয়ে মধুসূদন একাডেমির পরিচালক ও গবেষক কবি খসরু পারভেজ জানান, ১৮৬৫ সালে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে অবস্থানকালে মধুসূদন তাঁর শৈশবের স্মৃতিময় এই বটগাছকে কেন্দ্র করে ‘বটবৃক্ষ’ কবিতাটি রচনা করেন। পরবর্তীতে ১৮৬৭ সালে ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলি’ গ্রন্থে এটি প্রকাশিত হয়। তাঁর ভাষায়, “এই গাছটি শুধু একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়, এটি ছিল কবির স্মৃতি, আবেগ এবং বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।”

তবে দীর্ঘদিন ধরেই গাছটির সংরক্ষণ নিয়ে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গাছটি রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নিয়মিত পরিচর্যা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হলে হয়তো এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি আরও কিছুদিন টিকে থাকতে পারত।

এলাকাবাসী বলেন, ‘আমরা বহুদিন ধরে কবির স্মৃতিময় বটবৃক্ষটি রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু বটবৃক্ষটি রক্ষার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করায় কবির শেষ স্মৃতিচিহ্নটিও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এটা খুবই বেদনার এবং কষ্টের।’

এখন প্রশ্ন উঠছে, দেশের অন্যান্য ঐতিহাসিক ও স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণে কতটা কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে ঐতিহ্য সংরক্ষণে সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ঘটনার পর এলাকাবাসী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, এটি কেবল একটি গাছের পতন নয়, বরং জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান। 


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ